ডিজিটাল ঘড়ি

Monday, March 19, 2012

কাউকে ভালবাসি বলে -------------------- বিক্রম সাহা




কাউকে ভালবাসি বলে
নিষ্ঠুর হতে শিখেছে আমার মন।
কারো অপেক্ষায় থাকি বলে
আমার দু’চোখ সন্দেহে ভরেছে।
কাউকে ভালবাসি বলে
আমার স্বপ্নেরা আমার সাথে প্রতারনা করে।
কাউকে ভালবাসি বলে
আমার চোখ থেকে নুনুতা জলের পরিবর্তে
বের হয় নুনতা রক।
কাউকে ভালবাসি বলে
কখনো কখনো আমি দিকশূণ্য হয়ে পড়ি
ক্ষুধার্ত কাকের মত চিৎকার করি
কেউ জেন আমার হৃদপিন্ডে ছোবল মারে।

আট বছর আগের এক দিন ------------------------জীবনানন্দ দাস



শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হল তার সাধ। বধূ শুয়ে ছিল পাশে - শিশুটিও ছিল;
প্রেম ছিল,আশা ছিল-জোৎসনায়,-তবে সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।
এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি!

রক্তফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইদুঁরের মত ঘাড় গুজি
আধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনোদিন জাগিবেনা আর।

কোনোদিন জাগিবেনা আর।
জাগিবার গাঢ় বেদনার
অবিরাম - অবিরাম ভার
সহিবেনা আর -
এই কথা বলেছিলো তারে
চাঁদডুবে চলে গেলে - অদ্ভুদ আঁধারে
যেন তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোন এক নিস্তব্ধতা এসে।

তবুও পেঁচা জাগে;
গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে।
আরেকটি প্রভাতের ইশারায় - অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে
টের পাই যুথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা
মশা তার অন্ধকার সংগ্রামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রোদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি।
ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন - যেন কোন বির্কীন জীবন
অধিকার করে আছে ইহাদের মন;
চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বথের কাছে
একগাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা - একা,
যে জীবন ফড়িঙের,দোয়েলের-মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা
এই জেনে।

অশ্বথের শাখা
করেনি কি প্রতিবাদ ? জোনাকির ভিড় এসে
সোনালী ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে
করেনি কি মাখামাখি?
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা এসে
বলেনি কি; ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে
চমৎকার !
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!
জানায়নি পেঁচা এসে এ-তুমুল গাড় সমাচার ?

জীবনের এই স্বাদ-সুপক্ক যবের ঘ্রান হেমন্তের বিকেলের-
তোমার অসহ্য বোধ হলো;
মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো
মর্গে - গুমোটে-
থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে।
শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোন খাদ,
সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধু
মধু-আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাবাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ-জীবন কোনদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হ'য়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।

জানি - তবু জানি
নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয় -
আর এক বিপন্ন বিষ্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে,
ক্লান্ত - ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হ'য়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি,আহা,
থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে এসে,
চোখ পাল্টায়ে কয়: বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে ?’
চমৎকার !
ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার-

হে প্রগাঢ় পিতামহী,আজো চমৎকার ?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো-বুড়ি চাঁদটারে আমি
রে দিবো কালীদহে বেনোজলে পার;
আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

আছে আমার হৃদয় আছে ভরে --------- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



আছে আমার হৃদয় আছে ভরে,
এখন তুমি যা খুশি তাই করো।
এমনি যদি বিরাজ' অন্তরে
বাহির হতে সকলই মোর হরো।
 
সব পিপাসার যেথায় অবসান
 
সেথায় যদি পূর্ণ করো প্রাণ,
 
তাহার পরে মরুপথের মাঝে
 
উঠে রৌদ্র উঠুক খরতর।
এই যে খেলা খেলছ কত ছলে
এই খেলা তো আমি ভালবাসি।
এক দিকেতে ভাসাও আঁখিজলে,
আরেক দিকে জাগিয়ে তোল' হাসি।
 
যখন ভাবি সব খোয়ালাম বুঝি
 
গভীর করে পাই তাহারে খুঁজি,
 
কোলের থেকে যখন ফেল' দূরে
 
বুকের মাঝে আবার তুলে ধর'

কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি

প্রণয়ের প্রথম চুম্বন - কায়কোবাদ





**********
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
যবে তুমি মুক্ত কেশে
ফুলরাণী বেশে এসে,
করেছিলে মোরে প্রিয় স্নেহ-আলিঙ্গন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন?

********
প্রথম চুম্বন!
মানব জীবনে আহা শান্তি-প্রস্রবণ!
কত প্রেম কত আশা,
কত স্নেহ ভালবাসা,
বিরাজে তাহায়, সে যে অপার্থিব ধন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

**********
হায় সে চুম্বনে
কত সুখ দুঃখে কত অশ্রু বরিষণ!
কত হাসি, কত ব্যথা,
আকুলতা, ব্যাকুলতা,
প্রাণে প্রাণে কত কথা, কত সম্ভাষণ!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

**********
সে চুম্বন, আলিঙ্গন, প্রেম-সম্ভাষণ,
অতৃপ্ত হৃদয় মূলে
ভীষণ ঝটিকা তুলে,
উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ

"প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস"

----------------------রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


প্রহরশেষের আলোয়
রাঙা সেদিন চৈত্রমাস
তোমার চোখে দেখেছিলাম
আমার সর্বনাশ।।


এ সংসারের নিত্যখেলায়
 প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়
 বাটে ঘাটে হাজার লোকের
হাস্য-পরিহাস
মাঝখানে তার তোমার
চোখে আমার সর্বনাশ।।
আমের বনে দোলা লাগে,
মুকুল পড়ে ঝরে
চিরকালের চেনা গন্ধ
হাওয়ায় ওঠে ভরে।

মঞ্জরিত শাখায় শাখায়, মউমাছিদের পাখায় পাখায়,
ক্ষণে ক্ষণে বসন্তদিন
ফেলেছে নিশ্বাস


মাঝখানে তার তোমার
চোখে আমার সর্বনাশ।

Sunday, March 18, 2012

হার-মানা হার পরাব তোমার গলে-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


হার-মানা হার পরাব তোমার গলে-
দূরে রব কত আপন বলের ছলে।
   জানি আমি জানি ভেসে যাবে আভিমান-
     নিবিড় ব্যথায় ফাটিয়া পড়িবে প্রাণ,
   শূন্য হিঁয়ার বাঁশিতে বাজিবে গান,
       পাষাণ তখন গলিবে নয়নজলে।

শতদলদল খুলে যাবে থরে থরে,
  লুকানো রবে না মধু চিরদিন-তরে।
    আকাশ জুড়িয়া চাহিবে কাহার আঁখি,
   ঘরের বাহিরে নীরবে লইবে ডাকি,
    কিছুই সেদিন কিছুই রবে না বাকি-
        পরম মরণ লভিব চরনতলে।


রচনা: শান্তিনিকেতন ৭ বৈশাখ ১৩১


Saturday, March 17, 2012

"তোমার চোখ এত লাল কেন"


কবি : নির্মলেন্দু গুণ


আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না।
আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুকঃ
আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে কিনা,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুকঃ তোমার চোখ এতো লাল কেন?”